Home » জীবন-যাপন » আলট্রাসনো করতে যেয়ে দেখি ১৪ সপ্তাহের বাচ্চা পেটের মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে
ডাক্তারের দিনলিপি

আলট্রাসনো করতে যেয়ে দেখি ১৪ সপ্তাহের বাচ্চা পেটের মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে

ডা. সেলিনা সুলতানা স্মৃতি : আমার রোগীটা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের।প্রতিবারই আসলে বলে ,”ম্যাডাম,আমার কপালে ছেলে নাই।তিনখানই মেয়ে কেন?”আমি বলি,”আমরাও চারবোন। মেয়েদের মানুষ করো। ওরাই ছেলের মত আগলে রাখবে।”

বেচারার ইউটেরাস ভর্তি টিউমার । মাঝেমাঝেই কষ্ট পায়।আমার সাথে ঘনঘন দেখা করতে আসে। আসার ঘনত্ব কমাতে কিছু এডভান্স ঔষধ লিখে দিই। প্রতিবার ওর স্বামী ওর সাথে আসে। অধিকাংশ জনের স্বামী সাথে আসে না। মা বাবা বা ভাইবোনের উপর দায়িত্ব দিয়ে খালাশ। কিন্তু তিন মেয়ের মা বলে অবহেলায় ঘরে ফেলে রাখে না তার স্বামী। ব্যাপার টা আমাকে মুগ্দ্ধ করে বারবার।

মাঝেমধ্যেই ফ্রি দেখি বা ফ্রি সব পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করে দিই। ওদের কৃতজ্ঞতার অশ্রু আমার দৃষ্টি এড়ায় না। ওদের মেয়েদের গল্প,পরিবারের টুকটাক গল্পের অংশীদার হয়ে যাই আমি। রোগীদের সাথে গল্প করার বদনামে প্রায়ই আমার ম্যানেজার মুখর হয়ে ওঠে। কারণ রোগীর চাপ তাকে সামাল দেয়া লাগে। অবশ্য তাতে আমার তেমন কোন চেঞ্জ হয়না বলে বেচারা রণে ভঙ্গ দেয় মাঝেমাঝে ।

একদিন রোগীর ভীড়ে ঝপাত করে হাসিনা (ওহ্ বলাই হয়নি রোগীটার নাম হাসিনা) এসে হাজির। বললাম ,”এতবেলা করে আসছ কেন? আমাকে কি ট্রেন ধরতে দিবা না?”
বেচারা কাচুমাচু মুখ করে বললো ,”ম্যাডাম,কাজ করতে করতে দেরী হয়ে গেল। আজকের মত দেখে দেন।”
ওকে দেখতে গিয়ে আমার চখখু চড়কগাছ। আলট্রাসনো করতে যেয়ে দেখি ১৪ সপ্তাহের বাচ্চা পেটের মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে। আর অঘটন পটিয়সী মা বাবা জানেই না তাদের কর্মফল। আমার কাছে অপরাধীর মত মুখ করে দাড়িয়ে আছে দুই আসামী। আমি ওদের অভিনন্দন জানাতেই ঝরঝর করে কেদে ফেলল। ওরা এই বাচ্চাকে রাখবে না। এম আর ক্লিনিকে যেয়ে নাকি বাচ্চা নষ্ট করবে।

আরো পড়ুন :  মানুষের চোখও কি করোনার টার্গেট?

আমি সবসময়েই ঘোরতর বিরোধী বাচ্চা নষ্ট করার। বেচারারা বেশী কথা বলে যুৎ করতে পারল না। আমার ট্রেনের সময়ের কথা ভুলে গেলাম। এমন এডভান্স ষ্টেজে অজায়গায় কুজায়গায় গিয়ে বাচ্চা নষ্ঠ করলে আমার ট্রেনের হুইসেল না বাজলেও তার জীবনের হুইসেল বাজতে পারে। সতর্ক করার পর আচলে নখ খুটতে খুটতে নিমরাজী হলো।

যাওয়ার সময় বললো ,”এবার আমার ছেলে না হলে আপনার ছেলেটারে নিয়ে যাবোনে ম্যাডাম ।”ওর হুমকির পরোয়া না করেই বললাম ,”আমার ছেলে টাকে দিয়ে দিব নির্ঘাত। তবুও তুমি বাচ্চাটা নষ্ট করো না প্লিজ। আর তোমার মেয়ে হলে আমাকে দিয়ে দিও। অনেক আদরে রাখবো।”

আপাতত এই শান্তি চুক্তিনামায় ওরা চলে গেল। হঠাৎ কোন অঘটন ঘটাতে পারে এই শঙ্কায় পরের সপ্তাহেই ফলো আপে আসতে বললাম। আসলে আমার উদ্দেশ্য ছিল Counselling/Motivation করা। মাশাল্লাহ রোগীদের কমবেশী হিপনোটাইজ করতে পারি। পরের সপ্তাহে মানিকজোড় হাসিমুখে চলে গেল। বুঝলাম এবারের মত বাচ্চাটা বাচলো ইনশাআল্লাহ ।

আরো পড়ুন :  ময়দা ও আটার মধ্যে পার্থক্য কী?

অনেকদিন আর ওর দেখা নাই। আমিও অন্য রোগীদের চাপে ওকে একটু ভুলে গেলাম। আবার একদিন হন্তদন্ত হয়ে হাজির। এবারের আবেদন ছেলে না মেয়ে বলতে হবে। বললাম ,”এটা বলা আইনত দণ্ডনীয়।”
কিন্ত আলট্রাসনো করার সময় আমার চোখেমুখে অটোমেটিক বাতি জ্বলে উঠল। কোন অনুভূতি লুকাতে পারি না বলে ছলাকলায় আনাড়ি হওয়ায় সব জায়গায় ধরা খাই। সে রিয়েল লাইফ হোক আর প্রফেশনাল লাইফেই হোক।

আমার আকর্ণ হাসিই ওদের প্রশ্নোত্তর বলে দিল। নকল হাসি দিতে পারিনা বলে নিজেকে সেদিন প্রথম সুখী মনে হলো।আল্লাহ পাকের রহমত আর ডাক্তার ম্যাডামের Motivation সেদিন চোখের জলে ভাসালো বুভুক্ষু মাতৃহৃদয়।
তারপর উৎকণ্ঠিত দিন যাপন। এবার ও Counselling এর পালা নরমাল ডেলিভারীর জন্য। তিনটি নরমাল ডেলিভারী থাকলেও এবারের পুত্রধন কে নাকি এতগুলো টিউমার থাকা সত্ত্বেও সিজার করেই বের করতে হবে। অনেক বোঝানোর পর নরমাল ডেলিভারী তে রাজী হলো।

আরো পড়ুন :  আশুরার গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষা, করণীয় ও বর্জনীয়

ওর ফুটফুটে ছেলেকে কোলে নিয়ে মনে হলো ছেলেমেয়ে লিঙ্গীয় ভাবে আলাদা হতে পারে। কিন্তু বুকে জড়িয়ে ধরলে একই রকম শান্তি। ওদের গালের গন্ধ ,তুলতুলে নরম ঠোঁট আর মোলায়েম চামড়া ছুঁয়ে মনে হয় ওরা আমারই সন্তান।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি এক সন্তানের মা। কিন্তু আবেগের আর ভালোবাসার জায়গা থেকে আমি অনেকককক সন্তানের জননী।অনেক মায়ের কঠিন চলার পথে ওদের হাত ধরে হাটতে পারি। ওদের দুখের সুখের ভালোবাসায় সঙ্গী হতে পারি । এই ছোট্ট জীবনে ছোট্ট ছোট্ট চাওয়াগুলো অনেক দামী।

(Missing badly my lovely patients….এমন অনেক মায়ের গল্প হেটে বেড়ায় আমার সাথেসাথে। কথা বলে,হাসে,কষ্ট পায়।শুধু জানেনা এই পাগলী ডাক্তার টাও খুব মিস করে ওদের।)

ডাক্তারের দিনলিপি
ডা. সেলিনা সুলতানা স্মৃতি