Home » আমার বরগুনা » শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিশুদের পাঠদান, আতঙ্কে অভিভাবকেরা
ফাইল ছবি...

শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিশুদের পাঠদান, আতঙ্কে অভিভাবকেরা

বরগুনায় শতাধিক পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। এতে প্রাণহানিসহ ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। ফলে এসব ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ে যেতে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক বিরাজ করছে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তবে শিক্ষা বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের দাবি, এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরগুনা জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বরগুনা জেলার ৮০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০৮টি পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। বরগুনা সদর উপজেলায় ২২৯টির মধ্যে ১৩টি, আমতলী উপজেলায় ১৫২টির মধ্যে ৩৭টি, তালতলী উপজেলায় ৭৮টির মধ্যে ১৮টি, পাথরঘাটা উপজেলায় ১৪২টির মধ্যে ২১টি, বামনা উপজেলায় ৬৩টির মধ্যে ছয়টি এবং বেতাগী উপজেলায় ১৩৭টির মধ্যে সাতটি বিদ্যালয় পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এসব পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। 

বরগুনার তালতলী উপজেলার ৫ নম্বর ছোটবগী পি কে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৬৯ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টিতে ২০০২ সালে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করে স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) কর্তৃপক্ষ। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির অভিযোগ, ভবনটি নির্মাণের এক বছরের মাথায় গ্রেড বিমে ফাটল ধরে। এরপর মাঝেমধ্যে কোনোভাবে সংস্কারের মাধ্যমে ভবনটিতে চলে আসছিল শিক্ষা কার্যক্রম। গত ৬ এপ্রিল দুপুরে ক্লাস চলাকালীন একটি কক্ষের গ্রেড বিম ধসে পড়ে নিহত হয় মানসুরা আক্তার নামে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রী। এ ঘটনায় আহত হয় রুমা, সাদিয়া, ইসমাইল, রোজমা ও শাহীন নামের পাঁচ শিক্ষার্থী। মর্মান্তিক এ ঘটনার পর বিদ্যালয় ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সিলগালা করেছে প্রশাসন।

ছোটবগী পি কে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ জানান, বিদ্যালয় ভবনটি যে ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে অনেক আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে এ দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত মঙ্গলবার সকালে ক্লাস শুরুর কিছুক্ষণ আগে ভেঙে পড়ে ১৬ নম্বর মধ্য বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের একটি বিমের একাংশ। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীমা নিপা জানান, সকাল ৯টা ৫ মিনিটের দিকে যে কক্ষে ছাদের একাংশ ধসের ঘটনা ঘটেছে, ওই শ্রেণিতে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পাঠদানের প্রস্তুতি চলছিল। যে স্থানে ছাদের একাংশ ধসে পড়েছে, সে স্থানেই রিফাত নামের এক শিক্ষার্থী বসা ছিল। রিফাত ইউনিফর্ম পরে না আসার কারণে তাকে ইউনিফর্ম পরতে বাসায় পাঠানো হয়। এর এক থেকে দেড় মিনিটের মধ্যে ছাদ ধসের ঘটনাটি ঘটে। দু’বছর আগে থেকে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া এবং এ ভবনের ছবিসহ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হলেও তারা কর্ণপাত করেননি। যার ফলে বাধ্য হয়েই এ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস নিতে হচ্ছে। 

বরগুনা জেলা শিক্ষা নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, একাধিক বিদ্যালয় ভবন পরিত্যক্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান পিছিয়ে পড়ছে। তাই দ্রুত এসব ভবন পুনর্নির্মাণ অথবা সংস্কার করা জরুরি। 

বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমান বলেন, যেসব বিদ্যালয় ভবন পরিত্যক্ত অথবা ঝুঁকিপূর্ণ আছে, সেগুলো মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আশা করি, অল্প সময়ের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে।

বরগুনার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম কবির বলেন, বরগুনা জেলা উপকূলবর্তী হওয়ায় লবণাক্ততা ও আবহাওয়ার কারণে ভবনগুলো নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া এ ভবনগুলো নির্মাণের পর শিক্ষা বিভাগ থেকে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে ভবন রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য যে অর্থ দেওয়া হয়, তা দিয়ে সঠিকভাবে কাজ করতে না পারার কারণেও দ্রুতই ভবনগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া নির্মাণের সময় নিম্নমানের কাজ হলেও ভবন নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই পরিত্যক্ত হতে পারে।

বরগুনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ জানান, এরই মধ্যে সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, স্ব-স্ব উপজেলার শিক্ষা বিভাগের সমন্বয়ে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবনগুলোর বাস্তব অবস্থা জরিপ করে যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, সেখানে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থায় পাঠদান করা হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ কাজগুলো সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সূত্র: সমকাল