Home » জীবন-যাপন » করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা?
করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত

করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা?

আনিসুর রহমান এরশাদ : করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যান, তাদের পরিবারে শোক ও দুঃখ নেমে আসে। যারা সুস্থ হন তাদের শরীরেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকে। ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র থেকে নিয়ে লিভার-কিডনির ক্ষতি করে । রোগীর শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গে হামলা চালিয়ে অক্ষম করে দেয়। সুস্থদের শরীরও ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বহন করে। কারও কারও ক্ষেত্রে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যায়, প্রজনন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুস্থ হওয়ার পর শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা অনুভব করতে পারেন। চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক দৈন্যতা দেখা দেয়। আর করোনা সংক্রমণ এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীবন, জীবিকা; প্রভাব পড়ছে জীবনের সকল দিক ও বিভাগে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যেও ক্ষতির মাত্রায়-পরিমাণে কম-বেশি হচ্ছে। করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা- এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব এই লেখায়।

এক. মধ্যবিত্তরা

বাংলাদেশে ১৬ কোটি ৫৭ লাখ মানুষের চার কোটি পরিবার আছে৷ এর মধ্যে নিম্নবিত্ত ২০ ভাগ আর উচ্চবিত্ত ২০ ভাগ৷ মাঝের যে ৬০ ভাগ এরা নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত৷ এই সংখ্যা আড়াই কোটি পরিবার হবে৷ এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী, মাল্টিন্যাশনাল ও বড় কোম্পানিতে কাজ করা কিছু মানুষ বাদে অন্যরা সবাই সংকটে আছেন৷ অনেকেরই বেতন হয়নি, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে৷ ফলে তারা বেতন তো পাননি, উল্টো চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন; অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলক অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায়েছে৷ নির্ধারিত আয়ের প্রতিনিধিত্বকারী মধ্যবিত্তরা  মাস শেষে বেতন পায়; বেতনের বাইরে বিকল্প আয়ের সুযোগ নেই। খরচ বেড়ে গেলে তাদের জন্য এমনিতেই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আর করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তরাতো খুবই বিপাকে, কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হচ্ছে! দুর্ভোগ দিন দিন বাড়লেও সঙ্কোচের কারণে সাহায্য চাইতে পারছেন না। উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন; কারণ তাদের আয়ের উপর নির্ভরশীল গোটা পরিবার। এই শ্রেনীর অসহায় মানুষগুলো না পারেন মুখ ফুঁটে কিছু বলতে না পারেন কোথাও হাত পেতে কিছু নিতে। সম্মান তাদের কাছে বড়। আত্মসম্মানবোধের কারণে তারা দুঃখে কাঁদলেও শেয়ার করতে পারেন না, ব্যথা ভাগ করে নিতে পারেন না, নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ান, নিজের দুর্বলতা অন্যের কাছে প্রকাশ করেন না।

আরো পড়ুন :  ময়দা ও আটার মধ্যে পার্থক্য কী?

লোকলজ্জার ভয়ে খাবারের লাইনে দাঁড়ান না। সহায়তা নেয়া থেকে বিরত থেকে ইগো আঁকড়ে বেঁচে থাকেন। নিজেদের পরিস্থিতি বাইরের কাউকে তারা জানাতে পারেন না৷ অনেকে গরিব মানুষের পাশাপাশি সাহায্যের জন্য লাইনে দাঁড়ালেও পোশাক-আশাকে যথেষ্ট গরিব নয় বলে সাহায্য পান না। মন খারাপ করে নীরবে চোখের জল ফেলেন, অন্নের সংস্থান করতে না পারলেও না মরে বেঁচে থাকেন। কাজ নেই, আয় নেই, হাতে পয়সা নেই, সঞ্চয় নেই, খাবার মজুদ নেই। কষ্টে থাকা মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে তৈরি পোশাকের দোকানি, পুস্তক ব্যবসায়ী, কনফেকশনানি দোকানি, দুগ্ধজাত খামার, শিক্ষকসহ নানা পেশার মানুষেরা ভবিষত নিয়ে বেশ চিন্তিত। মধ্যবিত্ত মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়, শুধু সম্মানের সঙ্গে একটু খেয়ে-পড়ে বাঁচাটাই এদের জীবন। কেউ কুশল-মঙ্গল জিজ্ঞাসা করলে পেটে ভাত না থাকলেও মরতে মরতে বলে– ‘ভালো আছি’। দম বন্ধ হলেও হাসিমুখে বলে– ‘ভালো আছি’। খারাপ আছি বললে সামাজিক মর্যাদাহানী হয়, চাকরি হারিয়েছি বা বেকার আছি বললে ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়তে হয়৷ পড়ালেখা করে চাকরি করছে, না হয় কেউ ব্যবসা করছে, আবার কেউ কেউ স্বাধীন পেশা গ্রহণ করছে। তবে কায়িক শ্রমে এদের বেশ লজ্জা, অনিরাপদ চাকরিতে লজ্জা নেই। করোনা এদের আত্মপরিচয় সংকটকে প্রকট করে তুলেছে এবং জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। বিভিন্ন ধরণের ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে জড়িতদের দিনযাপন রীতিমতো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। যেসব গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বেতন দেয়া হয়নি অথবা চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে  তারা দিনযাপন করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

দুই. চাকরিচ্যুত ও বেকাররা

বিশ্বজুড়ে অব্যাহতভাবে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে আছে, যা মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক। চীনে চাকরি হারিয়েছেন ৮ কোটি মানুষ, ঝুঁকিতে আরও ৯০ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রে এপ্রিল মাসেই চাকরি হারিয়েছেন ২ কোটি ৫ লাখ মানুষ, বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন ৩ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ। ভারতে এপ্রিলে কাজ হারিয়েছেন ১২ কোটি মানুষ ২০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করা পাঁচ লাখের বেশি চাকরিপ্রত্যাশী বেকার খণ্ডকালীন আয়ের পথও বন্ধ থাকায় মহাসংকটে পড়েছেন।

আরো পড়ুন :  শবে বরাত : সুন্নাত না বিদআত?

চাকরিচ্যুত ও কর্মহীনরা অনেকে কৃষিশ্রমিক হবে।  অনেকেই ছাদে বা বারান্দায় সীমিত পরিসরে হলেও কৃষি কাজ করবে। কৃষি খামারিরা নিজস্ব সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলায় মনোযোগী হবেন। কৃষিবহির্ভূত খাতের কর্মীরা কর্মহীন অবস্থা থেকে উত্তোরণে নতুন কাজে যুক্ত হবেন।  পেশাজীবীদের পেশা বদলানো বা চাকরি পাওয়া যতটা কঠিন, দিনমজুর বা শ্রমিকদের কাজ পাওয়া ততটা কঠিন নয়। প্রযুক্তির প্রসারে ২০২৮ সালের মধ্যে ৮০০ মিলিয়নের বেশি লোক চাকরি হারাবে সারাবিশ্বে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অগ্রসর প্রযুক্তির ফলে ৫০ শতাংশ চাকরি চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তিন. দারিদ্র্যরা

হয়তো একদিন করোনা ঝড় থেমে যাবে। কিন্তু মানব সভ্যতায় যে আঁচড় পড়েছে, তা হয়তো থেকে যাবে চিরকাল। যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ৩০ বছরের অগ্রগতি নস্যাৎ হয়ে যাবে। এখনই যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৫ জনে এক শিশু অভুক্ত রয়েছে, মোট জনসংখ্যার ১৭.৪ শতাংশ মা এবং তাদের ১২ বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়েরা অর্থের অভাবে পর্যাপ্ত দৈনিক খাবার পাচ্ছেন না। ৩ কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে এমন আশঙ্কা ডব্লিউএফপির। ব্রিটেনে প্রতিদিন অনাহারে থাকছে ১৫ লাখ মানুষ। করোনা শেষ হয়ে গেলে বিশ্বের মোট ৭৮০ কোটি মানুষের অর্ধেকই দারিদ্র্যের মধ্যে থাকবে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন প্রায় ৪ কোটি। করোনায় দিন আনে দিন খায় এমন প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের আয় বন্ধ হয়েছে।

চার. শ্রমিকরা

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করেন৷ যারা দিন আনে দিন খায়৷ কাজ নেই, আয়-রোজগার নেই। খরচ আছে। যারা দিন আনে, দিন খায়; কাজ না করলে একদিনও চলে না, তারা এখন দিশেহারা।  করোনা আতঙ্কে সাধারণ অনেক মানুষ বাড়ি থেকে বের না হলেও উপায় নেই খেটে খাওয়া মানুষের। পেটে ভাত জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, ঠেলাগাড়ি চালক, রিকশাচালক, মিন্‌তি, ফড়িয়া, কয়ালরা চরম সংকটের মাঝে দিন কাটাচ্ছে। আড়ত মালিক, ফড়িয়া, কয়াল, দিনমজুর, মিন্‌তিসহ নানা ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষদের কাজ কমে গেছে। কাজ নেই বলে কেউ কেউ বাজারে আসেও না। কাজের বুয়া নারী, যুব সম্প্রদায় এবং বয়স্ক কর্মীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের পক্ষে জীবিকা নির্বাহ করা অত্যন্ত দুরূহ।

আরো পড়ুন :  বেতাগীতে জমজমাট চাঁইয়ের হাট

চাকরি হারানোদের তালিকায় আছে পরিবহন শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক, শপিংমলের শ্রমিক, পর্যটন-বিনোদন ও অবকাশযাপন কেন্দ্রের শ্রমিক, খাদ্য সরবরাহ ও পানীয় খাতের শ্রমিকরা। অটোরিকশা ও রাইডশেয়ারিং-এ যারা কাজ করেন তাদের অবস্থাও নাজুক৷ যারা দিন মজুরের কাজ করেন তাদের হাতেও কাজ নেই৷ নিম্নবিত্ত এসব মানুষ কিভাবে দিনযাপন করবেন? এদের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। শ্রমিকের মলিন মুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা।চরম দুর্দশায় রোজগারহীন পাঁচ কোটি শ্রমজীবী মানুষ।জীবিকার তাগিদে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেও তারা স্বপ্ন দেখছেন।

পাঁচ. ব্যবসায়ীরা

হজ, ওমরাহ, ট্রাভেল এজেন্সি ও ট্যুর অপারেটররা করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভালো নেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের গাড়ির ব্যবসায়ীরা, কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা, আম ও লিচু ব্যবসায়ীরা, জুতা ও কাপড়ের দোকানদাররা,  ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। অনেক প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা শিক্ষার্থীদের বেতন না পাওয়ায় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছেন না। লোকসানে বিপর্যস্ত ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

ছয়. কৃষক ও খামারিরা

করোনায় প্রান্তিক কৃষক, সবজিচাষী, ফলচাষী,  দুগ্ধ খামারিরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোগান থাকলেও চাহিদা কমে যাওয়ায় বড় সংকটে পড়েছে দেশে আমিষের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখা পোল্ট্রিশিল্প ও দুগ্ধশিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত খামারি ও উদ্যোক্তারা লোকসানের কারণে এখন দিশাহারা। লাখ লাখ কর্মসংস্থান পড়ছে হুমকির মুখে। দুগ্ধশিল্প খাতের প্রান্তিক খামারিরা পড়েছেন মহা মসিবতে। কার কাছে দুধ বিক্রি করবেন এমন ক্রেতা নেই। অগত্যা আত্মীয়-স্বজন কিংবা গরিব মানুষকে বিনা মূল্যে দুধ দিচ্ছেন। কেউ কেউ দুধের দাম না পাওয়ায় মাটিতেও ফেলে দিচ্ছেন। দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ দুগ্ধ খামার রয়েছে, যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ। এই অবস্থায় ব্যবসা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন  প্রান্তিক খামারিরা। কৃষি, ফুল, ফল, মত্স্য, পোল্ট্রি ও ডেইরি ফার্ম ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টরাও বিপাকে। পোল্ট্রিশিল্পের ডিম, বাচ্চা ও ব্রয়লার মুরগি বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে।


কেমন হবে করোনা পরবর্তী পৃথিবী?